শিল্প ও পোশাক কারখানা খুলে দেয়ায় এভাবেই লকডাউন উপেক্ষা করে ঢাকার উদ্দেশ্য যাচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ
আজ রবিবার থেকে গার্মেন্টসসহ রফতানিমুখী শিল্পকারখানা খুলে দেয়ায় কর্মজীবীদের বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মতো আসতে দেখা যায়। চাকরি হারানোর ভয়েই তাদের এ ছুটে আসা। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে চড়া ভাড়ায় তাদের ফেরা। সাইকেল, রিক্সা, অটো ইজিবাইক, ভ্যান, হলার ট্রলার, ট্রাক ও হোন্ডায় চড়ে তারা আসেন। কিন্তু ঢাকার প্রবেশমুখে তাদের দেখা গেছে-পুলিশের ভয়ে পায়ে হাঁটতে। এ সময় তাদের অভিযোগ অনুযোগের অন্ত ছিল না। রাজধানীর তিনটে প্রবেশমুখ আব্দুল্লাহপুর, সায়েদাবাদ ও গাবতলী আমিনবাজারে সরজমিনে দেখা গেছে-কর্মস্থলে ফেরাদের অধিকাংশই পোশাকশ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্য। রাজধানীতে ফেরা মানুষরা জানিয়েছেন, তাদের ফোন করে জানানো হয়েছে-১ আগস্ট থেকে গার্মেন্টস খুলছে। তাই চাকরি বাঁচাতে পথে সীমাহীন ভোগান্তি পাড়ি দিয়ে চলে আসা। ভাড়াও গুনতে হয়েছে কয়েকগুণ বেশি। বাস চালু না করে হঠাৎ করেই শিল্প-কারখানা খুলে দেয়ার এ সিদ্ধান্তে তারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। শনিবার সকাল থেকে আব্দুল্লাহপুর এলাকায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ফেরা মানুষের ভিড় দেখা যায়। হাতে-মাথায়-কাঁধে ব্যাগ। তাদের মধ্যে অসংখ্য নারী ও শিশু। তারা জানিয়েছে, বাস বন্ধ থাকায় লোকজন মূলত ভেঙ্গে ভেঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিক্সা, মাইক্রোবাস, পিকআপভ্যান, হেঁটে ঢাকায় এসে পৌঁছেছেন। অনেকেরই গন্তব্য টঙ্গী, গাজীপুর, আশুলিয়ার পোশাক কারখানা অধ্যুষিত এলাকা। সাইনবোর্ডে এসেও তারা পড়েছেন বিপদে। ভ্যানগাড়ি ছাড়া নেই কোন গাড়ি। পুলিশের ভয়ে দূরে দূরে থেকে এলাকার মধ্য দিয়ে চলছে অটোরিক্সা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে সাইনবোর্ড থেকে যাত্রাবাড়ীর দিকের সড়কে মানুষের সারি দেখা গেছে। তারা যানবাহনের অভাবে হেঁটেই যাচ্ছেন গন্তব্যে। বেশিরভাগই ভ্যানগাড়িতে গাদাগাদি করে যাচ্ছেন। রাকিব ও সামসুন্নাহার এসেছেন চাঁদপুর থেকে। রাকিব বলেন, আমরা থাকি নারায়ণগঞ্জে। সেখানে গার্মেন্টসে কাজ করি। ভাইঙা ভাইঙা অনেক কষ্ট করে আসছি। অফিস থেকে ফোন করছে, কাইল থেকে খোলা। তাই না আইসা উপায় নাই। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় অতিরিক্ত ভাড়া আর বিড়ম্বনা নিয়ে বিভিন্ন যানে করে ঢাকায় ফিরছে মানুষ। শিমুলিয়া-বাংলাবাজার ফেরি রুটে আঠারোটি ফেরির মধ্যে দশটি ফেরিতে করে পারাপার চলছে। দীর্ঘ ভিড়ের মধ্যেই পদ্মা পাড়ি দিচ্ছেন বেপরোয়া মানুষ। পদ্মার স্রোতে সঙ্গে পাল্লা দিতে না পারায় উপচেপড়া ভিড়েও ৭টি ফেরি বন্ধ রাখা হয়েছে। ফেরি ঘাটে ভিড়তেই হুড়োহুড়ি। কে কার আগে নামবে সেই প্রতিযোগিতা। কোথাও নেই স্বাস্থ্যবিধির বালাই। অনেকে মাস্ক পর্যন্ত পড়ছেন না। ঘাটে আসার পর কাভার্ডভ্যান ও নসিমনে পণ্যের মতো গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা। নানা রকম যানে অতিরিক্ত ভাড়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে রাজধানী ফিরছেন মানুষ। বাংলাবাজার ফেরিঘাটে তিল ধারণের ঠাঁই নেই । দক্ষিণবঙ্গের প্রবেশদ্বার খ্যাত মাদারীপুরের শিবচর বাংলাবাজার ফেরিঘাটে শনিবার ভোর থেকে ঢাকামুখী মানুষের স্রোত দেখা গেছে। মানুষের পাশাপাশি পণ্যবাহী গাড়ি, এ্যাম্বুলেন্স, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল পারাপারের অপেক্ষায় রয়েছে। লকডাউনের কারণে বাংলাবাজার ঘাটে বন্ধ রয়েছে লঞ্চ ও স্পিডবোড চলাচল। হাল্কা যানে কর্মস্থলে যেতে শ্রমজীবী মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে কয়েকগুণ। পাশাপাশি হাল্কা যানবাহনে ৪/৫ গুণ ভাড়া দিয়ে ঢাকা যেতে বাধ্য হচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার হাজার হাজার মানুষ। গণপরিবহন চালু না করে শিল্প-কলকারখানা খোলার সিদ্ধান্তে ভোগান্তি বেড়েছে কয়েকগুণ। দৌলতদিয়ায় জনস্রোত কাজে যোগ দেয়ার জন্য ছুটছে সাধারণ মানুষ। মহাসড়কে গণপরিবহন না থাকায় হেঁটে, ট্রাক, অটোটেম্পুসহ ইঞ্জিনচালিত যানবাহনে ওপর নির্ভর করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কর্মমুখী হচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিঞ্চলের ২১ জেলার সাধারণ মানুষ। গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। শনিবার সকালে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় গিয়ে ঘাট সংশ্লিষ্ট এবং এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া হয়। ভোগান্তি উপেক্ষা করে ছুটছে মানুষ ,শনিবার সকাল থেকেই ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে ঢাকাগামী যাত্রীদের ভিড় লেগে ছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে ভিড়। বিভিন্ন স্থান থেকে ইজিবাইক, ভ্যান রিক্সা যোগে টার্মিনালে এসে হাজির হচ্ছে তারা। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন এই কর্মজীবী মানুষ। কাজে যোগ দিতে ইজিবাইক, মাহেন্দ্রসহ ছোট ছোট যানে ঢাকায় ফিরতে হচ্ছে তাদের। বিপাকে বরিশালের পোশাক শ্রমিকরা শনিবার সকালে বরিশালে রাজধানীমুখী পোশাক শ্রমিকদের ঢল নেমেছে। কঠোর লকডাউনের কারণে যাত্রীবাহী বাস চলাচল না করায় মোটরসাইকেল, বিভিন্ন ধরনের থ্রি-হুইলার ও পণ্যবাহী যানবাহনে নানান কৌশলে যাত্রীরা ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েছেন। অনেকেই কোন ধরনের যানবাহন না পেয়ে হেঁটেই সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। চাকরি বাঁচাতে ট্রাকে উঠছেন নারী যাত্রী নাসরিন আক্তার (৩৮) গাজীপুর একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিকের চাকরি করেন। ঈদের আগের দিন ছুটিতে ময়মনসিংহের নান্দাইলে নিজ বাড়ি বেড়াতে এসেছিলেন। মহামারী করোনা মোকাবেলায় কঠোর লকডাউন থাকায় ৫ আগস্ট পর্যন্ত কারখানা বন্ধ থাকার কথা ছিল। রাজধানী ও এর আশপাশ এলাকার শিল্প-কারখানায় কাজে যোগ দিতে ফিরছে কর্মজীবী মানুষ। এ কারণে চাপ বেড়েছে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে। শনিবার সকাল থেকে ফেরিতেই পার হচ্ছে কর্মস্থল ফেরত মানুষের। গাদাগাদি করে গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে দৌলতদিয়া থেকে পাটুরিয়া আসছে কর্মজীবী মানুষেরা। ভম মহাসড়কে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নিরাপত্তার ঝুনিয়ে চলাচল করা এসব বিষয়ে পুলিশের তেমন কোন তৎপরতা দেখা যায়নি।